“নেতৃত্ব এমন একটি শিল্প যা দ্বারা আপনি যে কাজটি করতে

চান তা অনকে দিয়ে স্বেচ্ছায় করিয়ে নেয়া যায়।”

–য়াইট ডি আইজেনহাওয়ার

আমাদের আয়ােজিত নেতৃত্ব বিষয়ক একটি সেমিনারে একজন ম্যানেজার

নির্ধারিত সময়ের পূর্বেই উপস্থিত হয়েছিল। তার গায়ে গলফ খেলােয়াড়দের

মতাে জলপাই রঙের পলাে গেঞ্জি এবং সাদা ট্রাউজার।

সেমিনার শুরুর আগেই সে সরাসরি কক্ষের সামনে গিয়ে আমাদের বলী শুরু

করল।

– দেখুন, আপনাদের সেমিনারটি আমার জন্য বাধ্যতামূলক নয়, তাই আমি

এখানে যােগ না দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

– খুব ভালাে, কিন্তু আমি অবাক হচ্ছি শুধু একটা কথা জানার জন্য যে আপনি

সবার প্রথমেই হাজির হয়েছেন! নিশ্চয়ই আপনি আমাদের থেকে বিশেষ কিছু

জানতে চান।

ঠিক তাই, আমার কিছু জানার আছে। আমি শুধু জানতে চাই, আমার

বিক্রয় দলকে কীভাবে আরও উন্নত করতে পারি? আমি কীভাবে তাদের

পরিচালনা করব?

আপনি কি শুধু এটুকুই জানতে চান?

– হ্যা, এটুকুই।

– ঠিক আছে, আমরা আপনার সময় নষ্ট করব না এবং আপনি যেন নির্দিষ্ট

সময়ে গিয়ে গলফ খেলতে পারেন সে বিষয়টা আমরা নিশ্চিত করব।

ম্যানেজার সামনের দিকে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে তার কাঙ্খিত উত্তরের জন্য অপেক্ষা

করতে লাগল, কীভাবে তার দলের সদস্যদের পরিচালনা করা যায় এবং আমরা তার প্রশ্নের উত্তর দিলাম ।

– আপনি তা পারবেন না।

– কী?

– আপনি কাউকে পরিচালনা করতে পারবেন না। কাজেই এবার আপনি যেতে পারেন এবং আপনার খেলা উপভােগ করতে পারেন।

-আপনি এসব কী বলছেন? আমি ভেবেছিলাম পুরাে সেমিনারটি ‘অন্যদের

 

কীভাবে অনুপ্রাণিত করা যায় তার উপর অনুষ্ঠিত হচ্ছে! অথচ আপনি বলছেন

আমি পারব না, আসলে আপনি কী বুঝাতে চাচ্ছেন?

আমাদের সেমিনারে এই বিষয়টাই শেখানাে হচ্ছে। কিন্তু আমরা

ম্যানেজারদের প্রথম যে বিষয়টি বুঝাতে চাচ্ছি তা হলাে, ‘প্রকৃতপক্ষে, সরাসরি

আপনারা আপনাদের কর্মীদের পরিচালনা করতে পারবেন না। অনুপ্রেরণা

সবসময় আপনার কর্মীদের মধ্য থেকে আসতে হবে, আপনার থেকে নয়।

– তাহলে আপনারা কী শিখাচ্ছেন?

কীভাবে আপনি আপনার কর্মীদের নিজে নিজে অনুপ্রাণিত হতে উদ্বুদ্ধ

করবেন। এটাই অনুপ্রেরণার চাবিকাঠি এবং আপনাকে এটা করতে হবে চুক্তি

ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে, কর্মীদের পরিচালনা করে নয়। আর আজকের সেমিনারে

এ বিষয়টি নিয়েই আলােচনা করব।

কথা শুনে ম্যানেজার তার গাড়ির চাবি পকেটে রেখে সামনের সারিতে

বসে পুরাে সেমিনারটিতে অংশগ্রহণ করল। বাসায় এবং কর্মক্ষেত্রে মানুষের

আচরণ এবং আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টায় তিনি তার সারাজীবন অতিবাহিত

করেছেন। ফলে তার জীবন কষ্ট এবং হতাশায় পরিপূর্ণ ছিল। আমরা তাকে

দেখাতে চাচ্ছি, অনুপ্রেরণা নিজের ভেতর থেকে আসে, বাহির থেকে নয়।

আত্ম-শৃঙ্খলা শেখান।

“আপনি যা চাচ্ছেন তা স্মরণে রাখাই শৃঙ্খলা ?”

-ডেভিড ক্যাম্পবেল, প্রতিষ্ঠাতা, স্যাকস্ ফিফথ অ্যাভিনিউ

একটি পৌরাণিক কথা যা আমরা প্রায় সবাই বিশ্বাস করি তা হলাে, আমরা

সবাই ‘আত্ম-শৃঙ্খল’। এটা আমাদের মাঝে রয়েছে, বংশানুক্রমিক বৈশিষ্ট্যের

মতাে এটা আমাদের মাঝে থাকতেও পারে আবার নাও থাকতে পারে।

কিন্তু প্রকৃত সত্য হচ্ছে, আমরা সবাই ‘আত্ম-শৃঙ্খলা অর্জন করতে পারি। কিন্তু

প্রশ্ন হচ্ছে আমরা তা অর্জন এবং ব্যবহার করতে চাই কি না?

এটা অনুধাবনের আরেকটি পন্থা হচ্ছে : ‘আত্ম-শৃঙ্খলা অনেকটা ভাষার

মতাে। যেকোনাে শিশু একটি ভাষা শিখতে পারে (প্রকৃতপক্ষে সকল শিশুই

একটি ভাষা শিখে)। এমনকি ৯০ বছর বয়স্ক ব্যক্তিও কোন নতুন ভাষা শিখতে

পারে। আপনি ৯ বা ৯০ যাই হােন না কেন, আপনি যদি বৃষ্টিতে হারিয়ে যান।

তাহলে যেকোনাে অপরিচিত ভাষা ব্যবহার করে হলেও একটি উষ্ণ এবং

নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পেতে পারেন।

এই ক্ষেত্রে অপরিচিত ভাষাটি হচ্ছে আত্ম-শৃঙ্খলার মতাে যা আপনি কোনাে

কাজের জন্য ব্যবহার করছেন। এটা আপনার মাতৃভাষা নয় কিন্তু আপনি এটা

শিখতে এবং ব্যবহার করতে পারবেন। বাস্তবে, আপনি এটা আপনার

ইচ্ছামতাে কম বা বেশি ব্যবহার করতে পারবেন। এবং আপনি এটা যত বেশি

ব্যবহার করবেন, তত বেশি রপ্ত হবে।

ধরা যাক, একজন ইংরেজি ভাষাভাষী ব্যক্তিকে এক বছরের জন্য স্পেনে

বসবাস করতে এবং জীবিকা নির্বাহ করতে হবে। এখন সে যত বেশি স্প্যানিশ

ভাষা শিখবে, তত বেশি স্বচ্ছন্দে জীবনযাপন করতে পারবে। আপনি যদি পূর্বে

কখনও স্প্যানিশ ভাষায় কথা না বলেও থাকেন, তারপরও এই ভাষায় কাজ

চালিয়ে নিতে পারবেন।

আপনি একটি ইংরেজি বা স্প্যানিশ অভিধান বের করে কাজ চালিয়ে নেয়ার

মতাে ভাষা রপ্ত করতে পারবেন। আপনি ঐ অভিধান ব্যবহার করে কোন

দিক-নির্দেশনা বা সাহায্য চাইতে পারবেন! এজন্য আপনাকে কোন বিশেষ

ভাষায় দক্ষতা নিয়ে জন্মগ্রহণের প্রয়োজন নেই।

একই বিষয় আত্ম-শৃঙ্খলার ক্ষেত্রেও প্রযােজ্য। কিন্তু অধিকাংশ মানুষই এটা

বিশ্বাস করে না। অধিকাংশ মানুষের ধারণা, তাদের এটা আছে অথবা নেই।

অধিকাংশ মানুষের ধারণা এটা একটি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বা তাদের ব্যক্তিত্বের

স্থায়ীরূপ।

এটা একটা গভীর ভুল । এই ভুল আপনার জীবনকে ধ্বংস করে দিতে পারে।

কিন্তু সুখবর হচ্ছে আপনার এবং আপনার কর্মীদের এই স্কুলটি সংশােধনের

সময় এখনও চলে যায়নি।

মানুষ কীভাবে এই বিষয়টি ভুলভাবে গ্রহণ করে শুনুন : একজন ম্যানেজার তার

এক কর্মী সম্পর্কে বলছিলেন, “তার মধ্যে যদি বিন্দু পরিমাণ আত্ম-শৃঙ্খলা

থাকত, তাহলে সে আমার সবচেয়ে ভালাে বিক্রয় কর্মী হত। কিন্তু তার মধ্যে

সেটা নেই”।

কিন্তু এটা সম্পূর্ণ ভুল। কারণ, তার মধ্যে অন্যান্যদের সমপরিমাণ।

‘আত্ম-শৃঙ্খলা রয়েছে কিন্তু সে তা ব্যবহার করছে না। যেমন, আমাদের

প্রত্যেকেরই একই পরিমাণ স্প্যানিশ শব্দ শেখার সামর্থ্য রয়েছে।

 

এটা সত্য যে, আমি যত বেশি অভিধান খুলে শব্দগুলাে শিখব এবং ব্যবহার

ব, আমার জন্য স্প্যানিশ ভাষা শেখা ততাে সহজ হবে। অভিধানটিতে

আমি যত বেশি সময় ব্যয় করব এবং শব্দগুলাে অনুশীলন করব, স্প্যানিশ

ভাষায় কথা বলাটা তত সহজ হয়ে যাবে, মনে হবে এটা আমার জীবনেরই

একটা অংশ। টাইগার উডসের নিকট গলফ খেলা যত সহজ, অনুশীলনের

ফলে আপনার কাছেও ভাষী, অত্মি-শৃঙ্খলা ততাে সহজ হবে।

যদি আপনার অধীনস্থ কর্মীরা বুঝতে পারে আত্ম-শৃঙ্খলা অনুশীলনের মাধ্যমে

অর্জন করতে হয়, এটা আপনা থেকেই কারও মাঝে থাকে না; তাহলে ঐ ব্যক্তি

এটা ব্যবহার করে যেকোনাে লক্ষ্য অর্জন করতে সক্ষম হবে। ঐ ব্যক্তি তার

ইচ্ছানুযায়ী এটা ব্যবহার করতে পারবে, আবার ইচ্ছানুযায়ী এটা ফেলেও

রাখতে পারবে।

পরিবর্তে তারা দুশ্চিন্তা করে। তারা দুশ্চিন্তা করে এ জন্য যে, প্রয়ােজনীয়

বিষয়গুলাে তাদের মধ্যে আছে কিনা? এই বিষয়টা তাদের মধ্যে আছে কিনা?

তাদের পিতামাতা এবং অভিভাবকগণ তাদের মধ্যে এটা দিয়েছে কিনা? (কিছু

মানুষের ধারণা এটা পরীক্ষামূলকভাবে মানুষের মধ্যে দেয়া হয়, কিছু মানুষের

ধারণা এটা বংশানুক্রমে পাওয়া যায়। কিন্তু কোনটাই সত্য নয়। এটা

কোনভাবেই কারও মাঝে স্থাপন করা যায় না। এটা এক ধরনের হাতিয়ার, যা

সবাই ব্যবহার করতে পারে। হাতুড়ির মতাে। অভিধানের মতাে।)

আলােকিত নেতাগণ সবসময় তাদের কর্মীদের থেকে সেরাটা বের করেন,

কারণ তারা জানেন সফল হওয়ার সল উপাদান তাদের প্রতিটি কর্মীর মধ্যে

রয়েছে। তারা কোনাে অজুহাত, দুঃখ প্রকাশ বা অদৃষ্টের দোহাই (অধিকাংশ

অকর্মঠ লােকের হাতিয়ার) গ্রহণ করেন না।

উদ্দীপ্ত করার পূর্বে নিজকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করুন

“কীভাবে কাজ করতে হবে মানুষকে ৩ না বলে কী কাজ করতে

হবে শুধু সেটা বলুন এবং কাজটি তাদের নিজেদের

মতাে করে করতে দিন, ফলাফল দেখে আপনি অবাক হবেন!”

—জর্জ এস পল্টন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *