চলচ্চিত্র নির্মাণ টিপস-১

সিন ও সিকোয়েন্সের পার্থক্য চলচ্চিত্র নির্মাণে আগ্রহীদের কাছে সিন এবং সিকোয়েন্স শব্দ দুটি ব্যাপকভাবে পরিচিত। কিন্তু শব্দ দুটির পার্থক্য হয়তাে অনেকেই জানা নেই। শুধু তা-ই নয়, এটা নিয়ে আমাদের মাঝে বেশ কিছু ভ্রান্ত ধারণাও আছে। সত্যি বলতে কী আমাদের দেশে সিন এবং সিকোয়েন্সের যে সংজ্ঞাটি প্রচলিত রয়েছে তা চলচ্চিত্রের আন্তর্জাতিক , পরিমন্ডল থেকে অনেকখানিই ভিন্ন।

বলে রাখা ভালাে ইংরেজি সিন (scene) শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ দৃশ্য হলেও, সিকোয়েন্স (sequences) শব্দটির চলচ্চিত্রগত কোনাে বাংলা প্রতিশব্দ নেই। আমাদের দেশীয় সংজ্ঞাটি হল, একটি সিনের ক্ষুদ্রতর অংশ হচেছ সিকোয়েন্স। অপর দিকে আর্ন্তজাতিকভাবে সিকোয়েন্সের সংজ্ঞা হল, একই ভাব ধারার সিনসমূহ একটি সিকোয়েন্সের অন্তর্ভুক্ত।

অর্থাৎ সংজ্ঞা দুটি সম্পূর্ণ রূপে পরস্পরের বিপরীত। তবে উভয় ক্ষেত্রেই যে মিলগুলাে রয়েছে তা হল সিনের সাথে লােকেশন বা স্থান এবং সময়ের সম্পর্ক রয়েছে। আর সিকোয়েন্সের সম্পর্ক ভাব বা অনুভূতির সাথে । এবার সংজ্ঞা দুটোকে ভেঙে দেখা যাক। প্রথমেই দেশীয় সংজ্ঞা। ধরা যাক, নায়ক সকালে বাসা থেকে বের হয়ে রাস্তা দিয়ে বাস, রিকশা ইত্যাদি চড়ে অফিসে এসে পৌছালাে। অফিসের নিয়মিত কাজ শেষ করে সে আবার রাতে বাসায় ফিরে এলাে।

এখানে বাসা হল দৃশ্য-১, রাস্তা হল দৃশ্য-২, অফিস হল দৃশ্য-৩, এবং সব শেষে আবারও বাসা হল দৃশ্য-৪। এখানে দৃশ্য ১ ও ৪ এর লােকেশন একই থাকলেও সময়ের পরিবর্তন ঘটেছে। এখন দেখা যাক, দৃশ্য-১ এ বাসায় অফিস যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে গিয়ে নায়ক কী কী করল?

প্রথমে ঘুম থেকে উঠে বিছানা গােছালাে

(সিকোয়েন্স-১),

তারপরে বাথরুম সারল

(সিকোয়েন্স-২),

তারপরে নাস্তা খেল

(সিকোয়েন্স-৩),

তারপরে কাপড় পরে অফিস যাওয়ার প্রস্তুতি নিলাে

(সিকোয়েন্স-৪)।

ঘটনাগুলাে একই লােকেশনে এবং একই সময়ে ঘটলেও এখানে অভিনয়ের ধরন, পােশাক ও প্রপসের কন্টিনিউটি, আলাের তারতম্য অনেক কিছু বিবেচনায় রাখতে হয়। যেমন: ঘুম থেকে ওঠার সময় নায়কের চুল এবং বিছানা এলােমেলাে থাকবে।

কিন্তু নাস্তা করার সময় চুল পরিপাটি থাকবে। কারণ এর মাঝে সে বাথরুমের আনুসাঙ্গিক কাজগুলাে সেরে এসেছে। কাপড় পরার সময় তার বিছানা গােছানাে থাকবে। কারণ ঘুম থেকে উঠেই সে বিছানা গুছিয়েছে। একইভাবে ঘরের জানালা দিয়ে যে রােদ আসছে তা সময়ের সাথে সাথে বেশ খানিকটা পরিবর্তিত হবে। সুতরাং এখানে একই দৃশ্যের অংশ বলে এলােমেলােভাবে শুটিং করার কোন সুযােগ নেই।

যখন যে সিকোয়েন্সটা ক্যামেরায় ধারণ করা হবে তখন সেই সিকোয়েন্সের মাস্টার, মিড, ক্লোজ, ইনসার্ট যা কিছু লাগে সব একসাথে ধারণ করে নেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। না হলে কাহিনির ধারাবাহিকতা বা কন্টিনিউটির ব্যাঘাত ঘটতে পারে। এবার আন্তর্জাতিক সংজ্ঞা। একটি সিনেমায় কয়েক ধরনের ভাব সম্পন্ন দৃশ্য থাকে।

যেমন রােমান্টিক সিন, অ্যাকশন সিন, কমেডি সিন, ট্র্যাজেডি সিন ইত্যাদি। ধরা যাক, সিনেমার ১, ৫, ১৯ এবং ২৭ নম্বর দৃশ্যে রােমান্স রয়েছে। সুতরাং এই চারটি সিনকে রােমান্টিক সিকোয়েন্সের আওতাধীন বলে গন্য করা হবে। ২, ৬, ৯, ১২ ও ৩০ নম্বর সিনে অ্যাকশন রয়েছে। সুতরাং এই ৫টি সিন মিলে অ্যাকশন সিকোয়েন্স ইত্যাদি।

মূলতঃ সিকোয়েন্স বিষয়টি শুটিং এবং এডিটিং সংক্রান্ত সুবিধার জন্যে ব্যবহার করা হয়। অ্যাকশন সিকোয়েন্স শুট করতে যে সব প্রস্তুতি দরকার তা রােমান্টিক সিকোয়েন্সে হয়তাে প্রয়ােজন নেই। তেমনিভাবে কমেডি, ট্র্যাজেডি ইত্যাদি ভিন্ন ভিন্ন ভাব ধারার সিন-এর। শুটিং প্রস্তুতিও ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। তাই একই ভাবধারার দিনগুলােকে একসাথে শুটিং করে নেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। একইভাবে সম ভাবধারার সিনগুলােকে একসাথে এডিট করাও সুবিধাজনক।

সব মিলিয়ে বিষয়টা যা দাঁড়ালাে তা হচ্ছে, শুটিং করার সময় কাজের সুবিধার জন্যে একটা সিনকে কয়েকটি ছােটো ছােটো অংশে ভাগ করে নিতে হয়। এই অংশগুলােকেই আমরা ভুল করে সিকোয়েন্স বলে থাকি। এগুলােকে আপনি চাইলে পার্ট অফ সিন বা দৃশ্যাংশ বলতেই পারেন।

কিন্তু সিকোয়েন্স নয়। অপরদিকে একটি সিকোয়েন্সে যে কয়টি দৃশ্য থাকবে সেগুলাে যে একই সাথে পর পর থাকবে তাও নয়। প্রকৃত পক্ষে সিকোয়েন্স বিষয়টা শুধু মাত্র শুটিং প্রস্তুতির জন্যেই গুরুত্বপূর্ণ। স্ক্রিপ্ট লেখার সময় শুধু মাত্র সিন নিয়ে মাথা ঘামালেই চলবে। সিন সম্পর্কে আরাে যে কয়েকটি বিষয় বললেই নয়- অনেক সময় কাহিনির গুরুত্ব অনুযায়ী দেখা যায় একই বাড়ির বিভিন্ন ঘরের

চলচ্চিত্র নির্মাণ টিপস-২

ফোকাস শিফটিং

মাঝে মাঝেই বিভিন্ন শর্ট ফিল্ম নির্মাতার কাছ থেকে ফোন কল বা ফেসবুকে ম্যাসেজ পাই, “ভাই, আমি অমুক ক্যামেরা ব্যবহার করব । এই ক্যামেরাই কি ফোকাস শিফটিং করা যাবে?” অথবা “ডিএসএলআর ক্যামেরা ছাড়া নাকি ফোকাস শিফটিংএর কাজ করা যায় না। কথাটা কি ঠিক?” এই প্রশ্নগুলাে ছােটো, কিন্তু এর উত্তর ছােটো করে দেয়াটা একটু কঠিন। কারণ শুধু হঁ্যা বা না-তে উত্তর দিলে তার প্রেক্ষিতে আরাে নানা ধরনের প্রশ্নের উদয় হয়।

তাই বিষয়টার ব্যাখ্যা আমি একটু অন্যভাবে দিতে চাই। যেহেতু বিষয়টা ফোকাস শিফটিং, সেহেতু বুঝতেই পারছেন এখানে ফোকাস বিষয়টাই মুখ্য। আর ফোকাস বুঝতে গেলে বুঝতে হবে ডেপথ অফ ফিল্ড । আমরা অনেক ছবিতেই দেখতে পাই ছবিটির পুরােটা স্পষ্ট নয়, কিছু জায়গা স্পষ্ট আর কিছু জায়গা অস্পষ্ট।

যে জায়গাটা স্পষ্ট সেই জায়গাটাতে ফোকাস আছে আর বাকিটাতে ফোকাস নেই, এটাই আমাদের সাধারণ ধারণা। এই স্পষ্ট জায়গার পরিমাণ সব ছবিতে সমান নয়। কোনটার পুরােটা স্পষ্ট বা ফোকাসে রয়েছে। আবার কোনটার খুবই অল্প জায়গা স্পষ্ট বা ফোকাসে রয়েছে।

একটি ছবির কতটা জায়গায় ফোকাসে থাকছে সেটাকেই বা সেই পরিমাপটাকেই ডেপথ অফ ফিল্ড বলা হয়। ইংরেজি ডেপথ (Depth) শব্দের অর্থ গভীরতা আর ফিল্ড (Field) শব্দের অর্থ ক্ষেত্র। অর্থাৎ সাদা বাংলায় বলা যায়-একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ টিপস-৩ চলচ্চিত্র ও টিভি নাটকের স্ক্রিপ্টের পার্থক্য আপনারা যারা স্ক্রিপ্ট রাইটার হতে চান তাদের মনে রাখতে হবে যে স্ক্রিপ্ট লেখাই হয় চলচ্চিত্র বা টিভি নাটক নির্মাণ করার জন্যে।

সুতরাং আপনার লেখা স্ক্রিপ্ট নিয়ে কাজ করার সময় যেন নির্মাতাকে কোন রকম টেকনিক্যাল বা নন টেকনিক্যাল সমস্যার সম্মুখীন হতে না হয় সেটা বিবেচনায় রাখা একজন স্ক্রিপ্ট রাইটার হিসাবে আপনার নৈতিক দায়িত্ব। চলচ্চিত্র মাধ্যম এবং টিভি মাধ্যমের মাঝে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।

একজন সফল স্ক্রিপ্ট রাইটার হওয়ার জন্যে এই পার্থক্যগুলােকে গুরুত্বের সাথে স্মরণে রাখা বাঞ্চনীয়। প্রথমত: একটি টিভি স্ক্রিন সাধারণত ২১ ইঞ্চি বা ২৪ ইঞ্চি হয়ে থাকে। খুব বেশি হলে ৪৫ বা ৬০ ইঞ্চি। অপরদিকে একটি সিনেমার পর্দা মােটামুটি ১০ ফিট বাই ২০ ফিট বা তার চেয়েও বড় হয়ে থাকে।

অর্থাৎ একটা সিনেমার পর্দায় একই ফ্রেমে যতটা খুঁটিনাটি বিষয় তুলে ধরা সম্ভব একটি টিভির পর্দায় স্বাভাবিকভাবে তা সম্ভব নয়। সুতরাং একটি লং শট বা একটি মিড শটের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে যতটা খুঁটিনাটি ফুটিয়ে তােলা সম্ভব তা টিভিতে করতে হলে আপনাকে একাধিক ক্লোজ শটের আশ্রয় নিতে হচ্ছে।

অথবা যে বিষয়টা আপনি চলচ্চিত্রে দৃশ্যায়নের মাধ্যমে দেখাতে পারছেন টিভিতে তা আপনাকে ডায়লগের মাধ্যমে তুলে আনতে হচ্ছে। যদি একাধিক ক্লোজ শট ব্যবহার করা হয় তাে সেক্ষত্রে লেখকের কিছু করার নেই। কিন্তু ডায়লগের মাধ্যমে বিষয়টিকে ফুটিয়ে তুলবার ক্ষেত্রে লেখকের ভুমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *